দ্য ব্যাটল অফ কাদেশ। ক্রিশ্চিয়ান জাঁক। রামেসিস ৩
মিশরকে বাঁচাতে দুর্ধর্ষ হিট্টিবাহিনীর মুখোমুখি হতে হবে রামেসিসকে। কিন্তু অস্ত্র আর শক্তি - দু'দিক থেকেই এগিয়ে আছে হিট্টিরা। এদিকে যুদ্ধ এড়াবার কোনও উপায়ও নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, কাদেশ, উত্তর সিরিয়ায় হিট্টিদের সব কঠিন ঘাঁটিতে গিয়েই লড়তে হবে রামেসিসকে। আবার মিশর রক্ষায় যে পূর্ণ মনোযোগ দেবেন, সে উপায়ও নেই। ভয়াবহ এক অভিশাপের শিকার হয়ে দিন দিন দূর্বল হয়ে পড়ছেন রাজমহিষী।
ঘরে- বাইরে দু'দিক থেকেই বিপদ ধেয়ে আসছে। রাজমহিষীকে বাঁচাতে হলে দক্ষিনে যেতে হবে রামেসিসকে, নিয়ে আসতে হবে প্রাচীন এক গোপন প্রতিষেধক। এরপর এগোতে হবে উত্তরে, যেখানে হিট্টিরা অস্ত্র শান দিয়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে।
রামেসিস কী পারবেন এমন কঠিন সময়ে শক্ত হাতে সবকিছু সামাল দিতে?
বই সম্পরকিতঃ
নামঃ ক্রিশ্চিয়ান জাঁক
আনুবাদঃ ওয়াসি আহমেদ
নমুনা পাতা :
প্রখ্যাত ফারাও সেটির স্থাপিত দ্য অ্যাডােব অফ দ্য লায়ন বা সিংহের আবাস নামে
খ্যাত বসতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ডানিও’র ঘােড়া। উত্তপ্ত পথ ধরে এগােচ্ছে সে।
ডানিও'র বাবা মিশরীয়, মা সিরিয়ান। পেশা হিসেবে ডাকবাহকের সম্মানিত
পেশাটাকে বেছে নিয়েছে, বিশেষত্ব হচ্ছে জরুরী ভিত্তিতে ডাক আনা-নেওয়া করা।
সরকারই এই ঘােড়াটা দিয়েছে ওকে, সেই সাথে খাবার আর পােশাক তাে আছেই।
এছাড়াও আছে উত্তর-পূর্ব সীমান্তের সাইল এলাকায় একটা বাড়ি এবং রাস্তায় ডাক
বিভাগের যত সরকারী বাড়ি আছে, সবগুলােতে বিনামূল্যে থাকার সুযােগ। এক
কথায়, জীবনে কোনও কিছুর অভাব নেই। প্রতিনিয়ত দেশের নানা জায়গায় যেতে
হয়, সিরিয়ান মেয়েরা নিজেদেরকে বলতে গেলে ছুড়েই দেয় ওর দিকে। তবে
সম্পর্ক একটু বেশি গভীর হতে শুরু করলেই, আর খুঁজে পাওয়া যায় না ডাক
বাহককে।
| ওর কপালের লিখনই যে এমন। জন্মের কিছুসময় পরেই, গ্রামের জ্যোতিষিকে
দিয়ে ভাগ্য গণনা করিয়েছিল ডানিও’র বাবা-মা। তিনি জানিয়েছিলেন, ছেলেটার
কপালে আছে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানাে। হয়েছেও তাই! বন্ধন ওকে বিচলিত
করে তােলে, হােক না তা সুন্দরী রমণীর প্রলােভন। মুক্ত পথে পাড়ি জমানাের
আকর্ষনই বাঁচিয়ে রাখে ওকে।
তবে উপরওয়ালাদের কাছে ডানিও'র পরিচয় দক্ষ আর নির্ভরযােগ্য এক কর্মচারী
হিসেবে। এখন পর্যন্ত সবাই ওর কাজের প্রশংসাই করেছে। একটা চিঠিও এদিক
ওদিক হয়নি। শুধু তাই না, গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান প্রদানের ক্ষেত্রে ডানিও যেন
বাড়তি প্রচেষ্টা ঢেলে দেয়। মনে হয়, ডাক বিভাগে চাকরী করার জন্যই যেন ওর
জন্ম।
রামেসিস যখন তার পিতা, সেটি’র মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেন, অন্য সবার
মতাে সন্দিহান হয়ে উঠেছিল ডানিও। ভেবেছিল, তরুণ রাজকুমার আসলে ফারাও
হবার যােগ্য নন। রক্তপিপাসু এক যুদ্ধবাজ তিনি, হয়তাে সিংহাসনে বসেই যুদ্ধ-
বিগ্রহে লিপ্ত হবেন। কিন্তু না, রাজত্বের প্রথম চারটি বছর রামেসিস যুদ্ধের চাইতে
নির্মাণেই মন দিয়েছেন বেশি। লুভরের মন্দিরটা বড় করেছেন, কারনাকের স্তম্ভসারীর
কাজ শেষ করে ফেলেছেন, তার নিজের মন্দিরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করেছেন
এবং ব-দ্বীপে পাই-রামেসিস নামে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেছেন। এক বিন্দুর
জন্যও পিতার পররাষ্ট্রনীতি ভঙ্গ করেননি তিনি। মহান ফারাও সেটির পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ছিল, মিশরের চিরশত্রু, হিট্টিদের সাথে কোনও ধরনের ঝামেলায় না যাওয়া।
ফারাও রামেসিসও তাই করেছেন। এদিকে আনাতােলিয়ার মালভূমির অধিবাসী এই
হিট্টিদের মাঝেও ঝামেলা করার কোনও ইচ্ছা এই কদিনে দেখা যায়নি। সচরাচর
তারা সিরিয়া দখল করার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে!
| শান্তিতেই কাটছিল দিনকাল। আচমকা ডানিও উপলব্ধি করল, পাই-রামেসিস
আর হােরাসের পথে অবস্থিত দুর্গগুলাের মাঝে সামরিক যােগাযােগ উল্লেখযােগ্য হারে
বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিচিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এর কারণ জিজ্ঞাসা করে দেখেছে।
সে, কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারেনি। তবে গুজব রটেছে যে উত্তর সিরিয়া আর
মিশরের অধীনে থাকা আমুর প্রদেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে!
| ডানিও বুঝে নিল, যেসব তথ্য ও আদান-প্রদান করছে, তার মাধ্যমে হােরেসের
পথে অবস্থিত দুর্গগুলাের সেনাপতিদের সাবধান করে দেয়া হয়েছে।
সেটির সামরিক সক্ষমতার প্রশংসা করতেই হয়। কেননা তার তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টির
কারণেই কানান, আমুরু আর সিরিয়া এখন দুই চিরশত্রুর মাঝে একটা বড় নিষ্ক্রিয়
এলাকা তৈরি করে দিয়েছে। অবশ্য স্থানীয় শাসকদের উপর কড়া নজর রাখার
প্রয়ােজনীয়তা এতে বেড়ে গিয়েছে। নুবিয়ান স্বর্ণ হাত বদল করে সেই
প্রয়ােজনীয়তাও কমিয়ে আনা যায় অনেকাংশে। বিশেষ করে যখন আনুগত্য একদিক
থেকে অন্যদিকে যেতে শুরু করে, তখন। সেই সাথে মিশরীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি
বাড়তি প্রণােদনা যােগায়।
| অতীতে এক সময় এই হােরেসের পথ-এর দুর্গগুলাে বন্ধই করে দেয়া হয়েছিল।
ওখানকার সৈন্যদের কাজে লাগানাে হয়েছিল সীমান্ত রক্ষার্থে। হিট্টিরা এর আগে
কখনই এতােটা দক্ষিণে আসেনি।
সঙ্গত কারণেই ডানিও এখনও আশাবাদী। ওর মতে, হিট্টিরা মিশরীয়
সেনাবাহিনীকে ভয় পায়। অবশ্য মিশরীয়রাও ভয় পায় শত্রুপক্ষের নৃশংস প্রবৃত্তিকে।
সরাসরি যুদ্ধ হলে, দুই পক্ষেরই ক্ষতি হবে। তাই পরিস্থিতি যেমন আছে, তেমনভাবে
চলতে দেয়াই উত্তম। ফারাও রামেসিসের নির্মাণ কাজ নিয়ে মাতামাতি দেখে মনে
হয় না, যুদ্ধের কোনও ইচ্ছা তার আছে।
| সিংহের আবাস-এ ঢুকে পড়েছে, রাস্তার পাশের চিহ্ন দেখে বুঝতে পারল ডানিও।
এই এলাকার কৃষিভূমির বিস্তৃতি এখান থেকেই শুরু! হঠাৎ ঘােড়ার লাগাম টেনে ধরল
সে। কোনও একটা ঝামেলা আছে!
পরবর্তী চিহ্নের কাছে এসে, ঘােড়া থেকে নেমে পড়ল ডাকবাহক।
টের পেল, প্রস্তরফলকটাকে বিকৃত করা হয়েছে। সেই সাথে ওতে লেখা বেশ কিছু
অক্ষরও মুছে দেয়া হয়েছে। ঐশ্বরিক লেখাটা অপূর্ণাঙ্গ হয়ে যাওয়ায়, এই এলাকাকে
নিরাপত্তা দিতে পারবে না আর। যে দূর্বত্তরা এই কাজ করেছে, তাদেরকে কড়া শাস্তি
পেতে হবে। এহেন কর্মকাণ্ডের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
| ডাকবাহক ডানিও টের পেল, সে-ই প্রথম এই দৃশ্যটা দেখছে। স্থানীয়
সেনাপতিকে জানিয়ে সময় নষ্ট না করে, সরাসরি ফারাওকে জানাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সে।
উঁচু ইটের পাঁচিলে ঘেরা সিংহের আবাসখ্যাত এই বিখ্যাত স্থাপত্য। প্রধান দরজার
দুই পাশে আছে দুটো স্ফিংসের মূর্তি। কিন্তু সামনে এসে থমকে দাঁড়াল ডাকবাহক।
দুৰ্গটাকে ঘিরে রাখা বাঁধ তছনছ হয়ে আছে, স্ফিংসের মূর্তি দুটো পড়ে আছে
একপাশে। আস্ত নেই ও দুটোও।
সিংহের আবাস-এ আক্রমণ চালানাে হয়েছে!
কোনও টু শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না এখন। অথচ সারাদিন বসতিতে কাজ চলে!
সেনারা মহড়া দেয়, বৃদ্ধরা আলাপ আলােচনা করে, ঘােড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়,
বাচ্চারা ছুটোছুটি করে...বর্তমানের এই পিনপতন নীরবতাটুকু যেন ডানিও’র দম বন্ধ
করে দিল। শুকিয়ে আসা গলাটা ভেজাবার জন্য, পানির থলেটা থেকে কয়েক ঢােক
পানি খেল ও।।
শেষ পর্যন্ত ভয়ের সাথে লড়াইয়ে জয় হলাে কৌতুহলের। ডানিও’র উচিত ছিল
তৎক্ষণাৎ ফিরে গিয়ে সবচেয়ে কাছের গ্যারিসনকে জানানাে। কিন্তু কী হয়েছে, তা
নিজের চোখে দেখার লােভ সামলাতে পারল না বেচারা। অবশ্য ওকে দোষও দেয়া
যায় না। ওই বসতির প্রায় সবাইকে চেনে সে। বন্ধুই বলা চলে তাদেরকে।
ডানিও’র ঘােড়াটা ডাক ছেড়ে নড়ে উঠল। গলায় হাত বুলিয়ে প্রাণীটাকে শান্ত
করার চেষ্টা করল সে। কিন্তু ঘােড়াটা যেন পণ করেছে, এক পা-ও এগােবে না।
অবশেষে হেঁটেই রওনা দিল ডানিও। ভেতরে প্রবেশ করেই যেন থমকে দাঁড়াল।
দোতালা বাড়িগুলাের একটাও আস্ত নেই, আক্রমণকারীদের রােষ থেকে রক্ষা
পায়নি কোনওটাই। এমনকি রাজ্যপালের বাড়িটারও একই অবস্থা!
ছােট মন্দিরটারও একই দশা, একটা দেয়ালও অক্ষত নেই। ঐশ্বরিক সব চিত্র
আর মূর্তিগুলাে হয় মুছে ফেলা হয়েছে, নয়তাে ওগুলাের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে।
কুপে ভেসে আছে মৃত গাধাদের লাশ, শহরের মাঝখানের ঝর্ণার পাশে আসবাব
আর কাগজ পােড়া ছাই-এর স্তুপ।
আর গন্ধ...উফ! আচমকাই যেন অসহ্য একটা গন্ধ এসে ধাক্কা দিল ওর নাকে।
মাংসের বাজার থেকে গন্ধটা আসছে, টের পেয়ে সেদিকেই রওনা দিল ডানিও।
কমপ্লেক্সের উত্তর দিকে ওটা। সাধারণত ওখানেই পশু জবাই করে রান্না করা হয়।
বেশ ব্যস্ত জায়গা, এখানে এলে দুপুরের খাবারটা এই বাজারেই খায় ডানিও।
দৃশ্যটা নজরে পড়া মাত্র, শ্বাস নিতে যেন ভুলে গেল সে।
সবাইকে এক জায়গায় জড়াে করা হয়েছে-সৈন্য, ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, আবাল
বৃদ্ধ-বণিতা...সবাইকে। একজনের উপরে আরেকজনকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, গলা
কেটে হত্যা করা হয়েছে সবাইকে। গর্ভনরকে আলাদা করে শূলে চড়ানাে হয়েছে।
একটা কাঠের থামে হিট্টিদের ভাষায় লেখা-হিট্টিদের শক্তিশালী শাসক
মুওয়াত্তালীর বিজয় স্মারক। এভাবেই নিশ্চিহ্ন হবে তার সব শক্ররা।
হঠাৎ করেই সব পরিষ্কার হয়ে এল ডানিও’র কাছে। দুধর্ষ হিট্টি বাহিনী এখানে
অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছিল। রক্তপিপাসু এই দানবেরা কাউকে বাচিয়ে রাখে না।
Post a Comment
0 Comments